সম্প্রতি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে থাকা ব্যাংকের দুটি লকার থেকে ৮৩২ দশমিক ৫ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করেছেন দুর্নীতির তদন্তকারী সংস্থাগুলি। এসব স্বর্ণপ্রাপ্তি ঘটে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে, যেখানে এই সম্পদগুলো ছিল লকারে। এই ঘটনার পর থেকে ব্যাংকের লকার ও ভল্ট ব্যবহারের নিরাপত্তা ও এর সত্যতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাংকে মূল্যবান সামগ্রী রাখাটা কতটা নিরাপদ, লকারের বনাম ভল্টের মধ্যে পার্থক্য কী এবং গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে লকার খোলা সম্ভব কি না।
গত বছর ৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ব্যাংকের লকারগুলো জব্দ করেন দেশের অপরাধ তদন্ত ও গোয়েন্দা সংস্থা। সেই সময় উচ্চ আদালতের নির্দেশে অগ্রণী ব্যাংকের দুইটি লকার খোলা হয় এবং স্বর্ণগহনা জব্দ করা হয়। এর আগে, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি শাখা থেকে শেখ হাসিনার আরও দুটি লকারের সন্ধান পাওয়া যায়—নম্বার ৭৫১ ও ৭৫৩। আদালতের নির্দেশে এই দুটিই খুলে তা থেকে ৮৩২.৫ ভরি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনা গুলোর পর থেকেই ব্যাংকের লকার ও ভল্টের নিরাপত্তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক চলছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভল্ট ও লকারের মধ্যে মূল পার্থক্য ব্যবহারকারীর জন্য। ভল্ট হলো ব্যাংকের কেন্দ্রীয় নিরাপদ জায়গা যেখানে নগদ অর্থ, মূল্যবান সামগ্রী ও গুরুত্বপূর্ণ নথি রাখা হয়। অন্যদিকে, লকার হলো ভল্টের ভিতরে থাকা একটি ছোট, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বক্স, যেটা গ্রাহকরা ভাড়া নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত মূল্যবান জিনিস আমদানি-রক্ষা করেন। ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুযায়ী, লকারের জন্য গ্রাহকের উপস্থিতি আবশ্যক, তবে আদালতের আদেশে কখনো কখনো লকার খোলা হয়।
লকারের ক্ষেত্রে সাধারণত দুটি চাবির প্রয়োজন হয়—একটি ব্যাংকের কাছে থাকা ‘মাস্টার কি’ এবং অন্যটি গ্রাহকের। এই দুইটি চাবি একসঙ্গে থাকলে লকার খোলা যায়। লকারে প্রবেশের সময় গ্রাহক ছাড়া আর কেউ উপস্থিত থাকতে পারে না, কারণ এই ব্যবস্থার গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহক চানলে একক বা যৌথভাবে লকার ভাড়া নিতে পারেন।
ব্যাংকের ভল্ট রক্ষার জন্য মূলত কেন্দ্রীয় নিরাপদ এলাকা হিসেবে কাজ করে, যেখানে সম্পদ ও কাগজপত্র রাখা হয়। ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী ভল্ট ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট বা কোষাগার হলো সরকারের মূল অর্থ সংরক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
অগ্রণী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল বাশার বলেন, লকার খোলার জন্য দুটি চাবির প্রয়োজন হয়—একটি ব্যাংকের ‘মাস্টার কি’ ও অন্যটি গ্রাহকের। এই দুটি চাবি একসঙ্গে থাকলে লকারটি খোলা বা বন্ধ করা সম্ভব। কারণ এটাই লকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম উপায়। তিনি আরও বলেন, লকারের গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য সেখানে কখনো সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থাও থাকে না। প্রবেশ ও বাইরে আসার সময় একেকজনের প্রবেশ ইতিহাস লকের ভিতরে নথিভুক্ত হয়।
সাধারণ গ্রাহকরা নির্ধারিত ফিস দিয়ে ব্যাংকের লকার ভাড়া নিতে পারেন, যেখানে প্রয়োজনের সময় লকারের চাবি ও স্বাক্ষর দাখিল করতে হয়। লকারে থাকা সম্পদের নিরাপত্তা ও ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের নীতিও সক্রিয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সাধারণত ব্যাংকের কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই ব্যবহারের অনুমতি পান। এতে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠলে এখন এই সুবিধাও বন্ধ রয়েছে।
লকারের নিরাপত্তার জন্যই মূলত গ্রাহক বা তাদের মনোনীত ব্যক্তির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। তার কারণ, এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা লকারে রাখা সম্পদের সুরক্ষা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
শেক হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা এসব লকার থেকে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন ওঠেছে—গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে সম্পদের হিসাব কতটা সঠিকভাবে রাখা হয়, এবং এই সম্পদ জব্দের বিষয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের নির্দেশনা থাকলে ব্যাংকের লকার খোলার বিষয়টি প্রশ্নের বাইরে। তবে তদন্তের স্বার্থে এই বিষয়ে বেশি আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক।
অর্থনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষকরা বলতে থাকেন, এই ধরনের ঘটনাগুলোর মাধ্যমে ব্যাংকের লকার ও ভল্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কার্যকারিতা নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। যার ফলে, ব্যাংক গ্রাহকদের সম্পদের সুরক্ষা আরও জোরদার করার জন্য নতুন করে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করার আহ্বানও জোরদার হয়েছে।

















